দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীন থেকে পণ্য তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে শুল্ক এড়ানোর একটি বিশাল ‘ছায়া বাণিজ্য’ নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে হোয়াইট হাউস। নতুন এক প্রতিবেদনে ৪০টিরও বেশি দেশকে চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন উৎপাদন, বন্দর ও লজিস্টিকস কেন্দ্রকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর সেকশন ৩০১ শুল্ক আরোপের পর চীনা রপ্তানিকারকেরা ক্রমেই তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর কৌশল গ্রহণ করে। সামান্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনরায় লেবেলিং, প্যাকেজিং, চালান পরিবর্তন, নতুন করে ইনভয়েস তৈরি কিংবা নথিপত্রে পরিবর্তনের মাধ্যমে পণ্যের প্রকৃত উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
হোয়াইট হাউস এই ব্যবস্থাকে একটি বৈশ্বিক ‘শ্যাডো ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। উৎপাদন কেন্দ্র, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, বন্ডেড গুদাম, বন্দর ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্রকে ঘিরে এই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনা উৎসের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছানোর সময় সরাসরি চীনের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক এড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোনো দেশের নাম তালিকায় থাকার অর্থ ওই দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সব বাণিজ্য অবৈধ—এমন নয়। বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ, উৎপাদন স্থানান্তর এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণেও এসব দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যানালাইসিস অনুমান করেছে, ২০২৫ সালে মেক্সিকো, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো তিনটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলারের চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। পণ্যভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে করা এই হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার শুল্ক রাজস্ব হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে প্রথম সারির দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেশের বড় শিল্পভিত্তি, চীন-সংশ্লিষ্ট বিপুল বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় সারিতে রাখা হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামকে। চীনকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীর সংযোগ এবং উৎপাদন ও লজিস্টিক অবকাঠামোর কারণে এসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক, জুতা, পোশাক ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারকে তুলনামূলক ছোট কিন্তু সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কম মজুরি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, সীমান্ত করিডোর এবং তুলনামূলক দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে এসব এলাকা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভারতকে নিয়েও প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দেশটি চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্য প্রবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কিছু শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো চীন থেকে আসা পণ্য বা উপকরণকে যুক্তরাষ্ট্রগামী সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।
ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিকে বৈদ্যুতিক সুইচিং ও সার্কিট-সুরক্ষা সরঞ্জামের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পেনাং-কুলিম শিল্পাঞ্চলকে প্লাস্টিকজাত পণ্যের সঙ্গে এবং ইন্দোনেশিয়ার বেকাসি-বাতাম করিডোরকে প্লাস্টিকের বাক্স, কেস, ক্রেট ও প্যাকেজিং পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের আয়ুথায়া-সামুত প্রাকান করিডোরের সঙ্গে থার্মোস্ট্যাটের বাণিজ্যিক প্রবাহের সম্পর্কও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উৎপাদনভিত্তিক এবং লজিস্টিকভিত্তিক ট্রান্সশিপমেন্টের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। উৎপাদনভিত্তিক ক্ষেত্রে হালকা সংযোজন, ফিনিশিং, পরীক্ষা, লেবেলিং, প্যাকেজিং বা বিভিন্ন উপাদান একত্র করার মতো কাজ হতে পারে। আর লজিস্টিকভিত্তিক ব্যবস্থায় পণ্য পুনরায় রুট করা, গুদামজাতকরণ, নথি পরিবর্তন, ইনভয়েস পুনর্নির্মাণ, পুনরায় লেবেলিং ও রপ্তানি করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য মূল প্রশ্ন হলো—তৃতীয় দেশে সম্পন্ন করা কাজটি পণ্যের প্রকৃত ও ‘গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর’ ঘটিয়েছে কি না, নাকি শুধু পণ্যের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
কম্বোডিয়াকে প্রতিবেদনে এমন একটি উৎপাদনভিত্তিক ক্ষুদ্র কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে চীনা কাঁচামাল বা উপকরণ ব্যবহার করে সেলাই, লেবেলিং, প্যাকেজিং কিংবা চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর কম্বোডিয়ার নথিপত্রে পণ্য রপ্তানি করা হতে পারে। মালয়েশিয়াকে উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি সমুদ্রবন্দরভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে পোর্ট ক্লাং ফ্রি জোনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষুদ্র উৎপাদনকেন্দ্রের তালিকায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, ওমান, পানামা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এমন সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ফ্রি-জোন পুনঃরপ্তানি, পণ্য একত্র করা, গুদামজাতকরণ ও পুনরায় ইনভয়েস তৈরির সুবিধা রয়েছে।
সিঙ্গাপুরকেও প্রতিবেদনের তৃতীয় সারির দেশগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি এসব দেশকে চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্য পুনঃরুট করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুবিধাজনক এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্দর সুবিধা, বন্ডেড গুদাম, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, সীমিত পরিসরের উৎপাদন সক্ষমতা এবং শুল্ক প্রয়োগের দুর্বলতাকে এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য এই নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য আর্থিক আকার নিয়ে। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি হিসাবের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের সম্ভাব্য পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৩০৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ধরা হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব সবচেয়ে কম—প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। হোয়াইট হাউসের কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের হিসাব ৩৪ দশমিক ২ থেকে ৮৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এক্সিগারের কেন্দ্রীয় অনুমান প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে কমার্স বিভাগের বাণিজ্য স্থানান্তরভিত্তিক হিসাব ১০৯ বিলিয়ন ডলার এবং আলতানার সর্বোচ্চ অনুমান ৩০৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এসব হিসাব পরস্পরের সঙ্গে যোগ করা যাবে না এবং এগুলোর পদ্ধতিও এক নয়।
চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কই এই ব্যবস্থার প্রধান আর্থিক প্রণোদনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনে উৎপাদিত কোনো পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক থাকলেও তৃতীয় কোনো দেশে তুলনামূলক কম শুল্কে তা আমদানি করা গেলে উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য বড় আর্থিক সুবিধা তৈরি হয়। এর ফলে তৃতীয় দেশে হালকা সংযোজন, প্যাকেজিং, পুনঃরপ্তানি ও অন্যান্য লজিস্টিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অ্যান্টিডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং ডিউটির মতো অতিরিক্ত বাণিজ্যিক শুল্কও এই ধরনের প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে। চীনা সৌরপণ্যের ক্ষেত্রে অতীতে কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম হয়ে পণ্য পাঠানোর অভিযোগ ও তদন্তকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের এসব পরিসংখ্যান ও অভিযোগকে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অনুমান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি বা তৃতীয় দেশে উৎপাদন স্থানান্তর নিজেই অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো, তৃতীয় দেশে পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন বা রূপান্তর কতটা হয়েছে এবং শুল্ক এড়ানোর উদ্দেশ্যে উৎপত্তিস্থল পরিবর্তনের কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।